A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: Cannot modify header information - headers already sent by (output started at /home/webheart/public_html/sundayline/system/core/Exceptions.php:185)

Filename: libraries/Session.php

Line Number: 675

আত্মসাৎ করা অর্থ আদায় অনিশ্চিত
সংবাদ-শিরোনাম:
আত্মসাৎ করা অর্থ আদায় অনিশ্চিত

হল-মার্ক গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের দুই হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। আর এই অর্থের বিপরীতে তাদের সমুদয় সম্পদের আর্থিক মূল্য মাত্র দুই থেকে তিন শ কোটি টাকা। আর বিনিয়োগ করা টাকার পরিমাণ তিন থেকে চার শ কোটি টাকা। বাকি টাকার হদিস পাওয়া যায়নি। যে কারণে হল-মার্কের কাছ থেকে অর্থ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
হল-মার্ক ঋণ কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটনে গঠিত অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তদন্ত কমিটি গত বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কাছে এই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর কমিটির সদস্য তাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক এবং এ কে এম মাইদুল ইসলাম, এম এ মান্নান ও গোলাম দস্তগীর গাজীকে সদস্য করে এই কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটি হল-মার্ক কেলেঙ্কারির জন্য সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছে। বলেছে, জালিয়াতির প্রক্রিয়া গ্রাহকের উদ্ভাবিত নয়, ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমানের উদ্ভাবিত। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এই জালিয়াতিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। কমিটি আরও মনে করে, সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের দুর্বল তদারকির কারণে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।
জানতে চাইলে তদন্ত দলের প্রধান তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কমিটি সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং হল-মার্কের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে যা পেয়েছে, তাতে জালিয়াতির দায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। তবে, দুর্বল তদারকির দায় পরিচালনা পর্ষদকে বহন করতে হবে।
তদন্তে যা পাওয়া গেছে: সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখায় নিয়মনীতি ভঙ্গ করে অর্থ জালিয়াতি করা হয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া মোট অর্থের পরিমাণ তিন হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা। রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এ কে এম আজিজুর রহমান নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অপর্যাপ্ত ও অসম্পূর্ণ জামানত এবং ক্ষেত্রবিশেষ কোনো দালিলিক প্রমাণ ছাড়াই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ঋণ দিয়েছেন। উপশাখা ব্যবস্থাপক সাইফুল হাসান সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য হিসেবে ডিজিএমের অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা দায়িত্বে চরম অবহেলা করেছেন বলেই অর্থ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। পরিচালনা পর্ষদ কখনোই যথাযথ তদারকি করেনি। ২০০৯ ও ২০১০ সালে অনিয়ম ধরা পড়ার পরও তারা রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপকের (এ কে এম আজিজ) কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। এ অনিয়মের দায় মাথায় নিয়েই শাখা ব্যবস্থাপক ২০১১ সালে শাখার সর্বোচ্চ ঋণের সীমা ১৯১ কোটি টাকা অতিক্রম করে ৯১৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন। অথচ কর্তৃপক্ষ রূপসী বাংলা শাখাকে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং এ কে এম আজিজকে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি ট্যালেন্ট’ (অসামান্য প্রতিভাধর) হিসেবে অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এমনকি নীতিমালা অনুযায়ী তিন বছর অন্তর কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়। এ কে এম আজিজের ক্ষেত্রে তা-ও মানা হয়নি।
কোনো কারণ ছাড়াই ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই শাখায় ত্রৈমাসিক তদন্তকাজ হয়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন বিভাগ (আইটিএফডি) নির্ধারিত সময়ের দুই মাস পরে পরিদর্শন করে। এই দুই মাসে এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা জালিয়াতি হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বিষয়টি জানার পর তিনি শাখাটি পরিদর্শনের নির্দেশ দেন। আবার তিনিই নিরীক্ষা কাজে নিয়োজিত জিএম (মহাব্যবস্থাপক) মাসরুরুল হুদা সিরাজীকে তিনবার বদলি করে নিরীক্ষা কাজকে বিলম্বিত করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অনিয়মের কারণে দেশের মুদ্রাবাজারে সবচেয়ে বড় জোগানদাতা ব্যাংকটি ২০১১ সাল থেকে সবচেয়ে বড় ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এর কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের ছিল। কিন্তু ব্যবস্থাপনা বিভাগ ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিচালনা পর্ষদকে অবহিত করেনি। বরং রূপসী বাংলা শাখার বেআইনি কাজকে প্রশ্রয় দিয়ে এবং শাখাপ্রধানকে পুরস্কৃত করে জালিয়াতিতে ইন্ধন জোগানো হয়েছে। সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির এবং দুই ডিএমডি মাইনুল হক ও আতিকুর রহমান তদন্তকাজেও অসহযোগিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ডিএমডি মাইনুল হক সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে জালিয়াতি রোধ করা যেত।
তদন্ত কমিটির মতামত: প্রতিবেদন অনুযায়ী, হল-মার্কের বিপুল পরিমাণ ঋণের অঙ্ক তার রপ্তানি-বাণিজ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। গৃহীত ঋণের বিপরীতে হল-মার্কের সম্পদের আর্থিক দাম দুই থেকে তিন শ কোটি টাকা হবে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হল-মার্কের কাছে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা জামানত চাওয়া হয়নি। এ-সংক্রান্ত কোনো দলিলও শাখায় নেই। যে কারণে হল-মার্কের কাছ থেকে ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
হল-মার্কের বিনিয়োগ করা টাকার পরিমাণ তিন থেকে চার শ কোটি টাকার বেশি নয়। বাকি টাকা কোথায় গেছে, তার হদিস সংসদীয় কমিটি পায়নি। বলা হয়েছে, হল-মার্ক ছাড়া আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান একই কায়দায় অর্থ জালিয়াতি করেছে। এতে পরিষ্কার যে, জালিয়াতির প্রক্রিয়া গ্রাহকের উদ্ভাবিত নয়, কে এম আজিজুর রহমান এর উদ্ভাবক। শেরাটন শাখার মূল্যবান দলিল (পাঁচ হাজার) হল-মার্কের অফিসে পাওয়া যাওয়ার ঘটনাও ব্যাংকের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
উপশাখা ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম সংঘবদ্ধ চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ওহিদুজ্জামান ও গফুর নামের দুই কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার পরও রপ্তানিকারীর বেতনে বাইরের (আউটসোর্সিং) জনবল হিসেবে রূপসী বাংলা শাখায় কাজ করেছেন। তাঁদের পরামর্শে বেশ কিছু অনিয়ম হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের মার্চে হল-মার্ক, ববি ফ্যাশনস, ওয়ালমার্ট ফ্যাশনস, টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিশন ও ড্রেস মি ফ্যাশনসের অনুমোদিত ঋণসুবিধার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। রূপসী বাংলা শাখা এই সুবিধা নবায়ন না করে ঋণ বিতরণ অব্যাহত রাখে। ৩০ কোটি টাকা করে আটটি আলাদা ঋণ প্রস্তাবের মাধ্যমে মোট ২৪০ কোটি টাকার ঋণ প্রস্তাব প্রধান কার্যালয় কর্তৃক অনুমোদন করেনি। তা সত্ত্বেও হল-মার্কের ঋণসীমা ২৪০ কোটির পরিবর্তে ৯৯৯ কোটি হয়ে গেল, এটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানবে না, তা হতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা প্রসঙ্গ: প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী পেনশন হিসাবের কাজ ছাড়াও রূপসী বাংলা হোটেলের কোনো অনুষ্ঠানে গেলে এ কে এম আজিজের অনুরোধে শাখাতে গিয়েছেন। তাঁর পদমর্যাদা অনুযায়ী ওই শাখায় ঘন ঘন যাতায়াত মানানসই নয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শাখা ব্যবস্থাপক উপদেষ্টার ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়েছেন।
সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী কমিটিকে জানিয়েছেন, সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজের স্ত্রী জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন করতেন এবং দামি গাড়িতে করে তাঁর বাসার এসেছিলেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান মোদাচ্ছের আলীকে প্রশ্ন করেন, মনির আহমেদ শিকদারের নেতৃত্বে সোনালী ব্যাংকের নিরীক্ষা দল রূপসী বাংলা শাখায় গেলে আপনি সেখানে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কাজে বাধা দিয়েছেন। অর্থনৈতিক লাভের কারণে আপনি হল-মার্কের অফিসে যাতায়াত করতেন? জবাবে মোদাচ্ছের আলী বলেন, ‘আমি সেখানে গেলে তাঁরা আমাকে তাঁদের কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেন। আমি তাঁদের আমার কার্ড দিয়ে বলেছি, কোনো সমস্যা হলে যেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অর্থনৈতিক লাভের অভিযোগ সত্য নয়। আমি সরলবিশ্বাসে সেখানে গিয়েছি।’
তবে কমিটির কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, নিরীক্ষার সময় স্বাস্থ্য উপদেষ্টার উপস্থিতি বাংলাদেশে ব্যাংকের নিরীক্ষা দলের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
সভার কার্যবিবরণী থেকে: সংসদীয় উপকমিটির সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, সংসদীয় দলের প্রশ্নের জবাবে সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আবুল হাসেম জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ দলিলসহ সোনালী ব্যাংকের পাঁচ হাজার ফাইল হল-মার্কের অফিস থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো এক হাজারের বেশি ফাইল হল-মার্কের অফিসে রয়েছে। লেনদেনসংক্রান্ত ভাউচারসহ অধিকাংশ দলিল হল-মার্ক তৈরি করে দিত।
কমিটির সুপারিশ: তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর সার্বিক কাজ ডিজিটাল করা উচিত। এতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় কমবে এবং তদারকি ও আয় বাড়বে। পরিচালনা পর্ষদের নিয়োগ অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট’ অনুযায়ী হওয়া আবশ্যক।
এমডি ১৮ কোটি টাকা, ডিএমডি ও জিএমদের অনেক বড় অঙ্কের টাকা ঋণ দেওয়ার ক্ষমতার কোনো যুক্তি নেই বলে তদন্ত কমিটি মনে করে। কমিটি বলেছে, ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা এককভাবে কারও ওপর ন্যস্ত থাকা উচিত নয়। বোর্ডের সদস্যদের নিয়ে একটি নির্বাহী কমিটি এবং নিরীক্ষা (অডিট) কমিটি থাকার কথা থাকলেও সোনালী ব্যাংকে নির্বাহী কমিটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ সংবাদ সমুহ: